গল্প কথা


বোহেমিয়ার কেলেঙ্কারি (অধ্যায়-১)


ডক্টর ওয়াটসনের জবানবন্দি—

শার্লক হোমসের কাছে তিনি সর্বদাই ছিলেন শুধু “সেই নারী।”

শুধু এটুকুই। আর কোনো নাম নয়। আইরিন অ্যাডলার — এই নামটি হোমসের ঠোঁটে খুব কমই উচ্চারিত হয়েছে। কিন্তু যখনই প্রসঙ্গ এসেছে, তার কণ্ঠে এক অদ্ভুত নীরবতা নেমে আসত — যেন কোনো এক অচেনা অনুভূতি তাকে ভেতর থেকে স্পর্শ করে যাচ্ছে, অথচ সে নিজেই তা স্বীকার করতে নারাজ।

হোমস কি তাকে ভালোবাসতেন? না। সেই অর্থে নয়।

প্রেম, আবেগ, হৃদয়ের দুর্বলতা — এসব তার কাছে ছিল একটি নিখুঁত যন্ত্রের ভেতর হঠাৎ ঢুকে পড়া বালুকণার মতো। বিরক্তিকর। অপ্রয়োজনীয়। বিপজ্জনক।

তবু আইরিন অ্যাডলার ছিলেন আলাদা।

সে কারণ হয়তো এই নয় যে তিনি সুন্দরী ছিলেন, বা রহস্যময়ী ছিলেন। বরং কারণটা ছিল আরও গভীরে — তিনি ছিলেন সেই বিরল মানুষ, যিনি শার্লক হোমসকে একবার, শুধু একবারের জন্য হলেও, পরাজিত করেছিলেন। এবং হোমস সেটা মনে রেখেছিল। হয়তো অনিচ্ছায়, হয়তো কিছুটা বিস্ময়ের সঙ্গে — কিন্তু রেখেছিল।


আমার বিয়ের পর হোমসের সঙ্গে দেখা-সাক্ষাৎ অনেকটাই কমে গিয়েছিল।

নতুন জীবন, নতুন সংসার — এসব আমাকে ধীরে ধীরে সেই পুরোনো পৃথিবী থেকে দূরে সরিয়ে নিয়ে গিয়েছিল। বেকার স্ট্রিটের সেই ধোঁয়াটে ঘর, অদ্ভুত সব রাত জাগা, ভায়োলিনের একাকী সুর — সব কিছু স্মৃতির আবরণে ঢাকা পড়তে শুরু করেছিল।

হোমস কিন্তু বদলায়নি।

সে তখনও একা, তখনও বইয়ের স্তূপে ডুবে থাকা মানুষ। কখনো কোকেনের অলস নেশায় দিন পার করছে, কখনো আবার নতুন কোনো রহস্যের গন্ধ পেয়ে হঠাৎ জীবন্ত হয়ে উঠছে। পুলিশ যে মামলা বন্ধ করে দিয়েছে, সে সেখান থেকেই শুরু করছে।

মাঝে মাঝে সংবাদপত্রে তার নাম দেখতাম। ওডেসার ট্রেপফ হত্যাকাণ্ড, ত্রিনকোমালির অ্যাটকিনসন ভাইদের রহস্য, হল্যান্ডের রাজপরিবারের জন্য কোনো এক গোপন অভিযান — খবরের পাতায় তার ছায়া দেখতে পেতাম, কিন্তু সামনাসামনি দেখা হচ্ছিল না।


১৮৮৮ সালের ২০ মার্চ।

সন্ধ্যাটা ছিল ঠান্ডা আর ধূসর। এক রোগীর বাড়ি থেকে ফিরছিলাম। হাঁটতে হাঁটতে হঠাৎ চোখ পড়ল — বেকার স্ট্রিট।

পরিচিত রাস্তা। পরিচিত বাড়ি। সেই পুরোনো দরজা।

বুকের ভেতর কী একটা নড়ে উঠল।

ইচ্ছে করল — একবার যাই। শুধু একবার।

উপরে তাকিয়ে দেখলাম ঘরে আলো জ্বলছে। পর্দার আড়ালে সেই চেনা ছায়া — লম্বা, রোগা, একটু ঝুঁকে পড়া। দুই হাত পেছনে বাঁধা, ঘরের এ-মাথা থেকে ও-মাথা পায়চারি করছে।

আমি চিনতে পারলাম। মুহূর্তের মধ্যে।

সে আবার কিছু একটা নিয়ে ভাবছে। সেই পুরোনো হোমস — যাকে আমি এত মিস করেছিলাম, হয়তো নিজেও জানতাম না।

আমি কলিং বেল চাপলাম।


Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *